জনাব কা‌জি মাসুম আখতার সা‌হেব..

পাঠ‌কের কল‌মে, টাইমস্ বাংলা: আপনি আগে যে মাদ্রাসায় প্রধানশিক্ষক ছিলেন আমি সেই মেটিয়াবুরজের ঐতিহ্যসম্পন্ন এক স্কুলে সহ প্রধানশিক্ষক রূপে আমার কর্মজীবন শেষ করেছি। আপনি হয়তো আমাকে চেনেন আমার লেখালেখির জন্যে আমিও তেমনই আপনাকে চিনি আপনার লেখালেখি, প্রাক্তন বিদ্যালয়ের যাবতীয় কর্মকান্ডের জন্যে আর এখন ফেসবুকের বদৌলতে। আসলে আপনার একটা মঞ্চ দরকার ছিল তা আপনি পেয়ে গেছেন। যদিও পাওয়া না পাওয়াটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যপার। কিন্তু সাধারণের মনে হয়েছে যখনই আপনি কোন বিশেষ রাজনৈতিক ভাবনার তাঁবেদারি করা শ্যামাপ্রসাদ পুরস্কার পেলেন তখনই আপনি আপনার নীতি বিসর্জন দিয়েছেন। যদিও নীতি বিষয়ে আপনার দ্বিচারিতা প্রথম থেকেই লক্ষ্য করা গেছে। যেমন আজকেই বর্তমান মুসলিমদের নিকৃষ্ট বললেন তেমনই চারিদিক থেকে রে! রে! রে! আওযাজ ওঠায় আপনি সম্পাদনা করে নিলেন আবার পরবর্তী পোস্টে মুসলিমদের নিকৃষ্ট হওয়ার বিষয়ে আপনি আপনার মত দিলেন। বক্তব্যটি ঠিক এইরকম–

‘এবার আসি ‘নিকৃষ্ট’প্রসঙ্গে।তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম–মুসলিমরা বিশ্বের উৎকৃষ্ট।তাহলে আপনারা প্রমান করুন-পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর নিরিখে বর্তমান বিশ্বকে সমৃদ্ধ করতে তাদের ভূমিকা কি ? উত্তর প্ৰায় জিরো। শিক্ষা, স্বাস্থ্য,সম্পদ, শান্তি,সম্মান বা সবলতার নিরিখে তাদের অবস্থান আজ কোথায় ?দুর্বল–তাই সবাই যত মারছে,এরা ততই ধর্মাচরণ,লোকাচারের আবর্তে নিজেদের আরো গুটিয়ে নিচ্ছে।ধর্ম ছাড়া এদের যেন কোনো পরিচয় নেই।এদের শক্তি কি তাহলে কেবল সন্ত্রাসী জেহাদ ? ইমাম বরকতি কি ভারতীয় মুসলমানদের পাকিস্তানি করতে এই জেহাদেরই বার্তা দিলেন ?ইসলামিক বা মুসলিম প্রধান দেশগুলির অস্বাভাবিক খুনোখুনি,হিংসা,দারিদ্র,অশিক্ষা,অস্বাস্থ্য,সন্ত্রাস,অনুন্নয়ন,অগনতান্ত্রিক পরিবেশ সর্বোপরি,পশ্চিমি শক্তিগুলির পদলেহন করতে বাধ্য হওয়া কি মুসলিম জনগোষ্ঠীর উৎকৃষ্টতার লক্ষণ ?বিশ্বের আর কোন প্রধান ধর্মীয় জনগোষ্ঠী এর চেয়ে বেশি যন্ত্রনায় (আযাব) রয়েছে ? এদের উৎকৃষ্টতা কেবল ধর্মীয় জিগির ,ফতোয়া বা ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব -এর ভড়ং সর্বস্ব নয় কি ?আমি’ নিকৃষ্ট’ শব্দটি এই অর্থেই ব্যবহার করেছি।যারা নির্বোধ ও ধর্মান্ধ হয়ে গালাগাল দিচ্ছেন, তাদের আসলে নিকৃষ্ট ছাড়া আর কি বলা যায় – আমার জানা নেই।দুঃখিত।
একদা মধ্যযুগে যারা ইউরোপে জ্ঞান বিজ্ঞানের আলো জ্বেলেছিলো,আজ কেন তাদের এতো করুন দশা ?’

আপনি বোধ হয় ভুলে গেছেন মুসলিম প্রধান মোট ৫০-৫৫ টি দেশ আছে। তার মধ্যে আফগানিস্থান, ফিলিস্তিন, ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া আর লিবিয়াতে সার্বিক লড়াই চলছে, পাকিস্তানে চলছে আংশিক। ও সব দেশে যে লড়াই, আপনি না জানলেও আমরা জানি ওখানকার মানুষদের উপর চাপিয়ে দেওযা হয়েছে। প্রথমে ‘পৃথিবীর সব থেকে নিকৃষ্ট জনজাতি’… ফিলিস্তিনের প্রকৃত নাগরিকদের হটিয়ে ইসরায়েল সৃষ্টির আগে, আফগানিস্থানে রুশ আক্রমণের আগে (বসনিয়া-কসোভোতেও রুশ আগ্রাসন হয়েছিল যদিও এখন শান্ত) তারপর একে একে যুক্তরাষ্ট্র কতৃক আফগান, ইরাকি, ইয়েমেনি, লিবীয়, সিরীয় গণহত্যার আগে ‘নিকৃষ্ট’ ছিল কি? আপনি তো রুশ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সমর্থন করে বসলেন। আপনার খড়্গহস্ত হওয়ার ছিল আগ্রাসন আর আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে। উল্টে যারা আত্মনিয়ন্ত্রণের লড়াই লড়ছে তাদেরই দোষারোপ করছেন!

আপনি বলেছেন, (এবং এটা সত্যও) মধ্যযুগে ইউরোপে যারা বিজ্ঞানের আলো জ্বেলেছিল সেই আরবরা জীবনচর্চার প্রতিটি স্তরে উন্নত ছিল, অন্ধকারে ছিল ইউরোপীয়রা। এটা কাল বা ইতিহাসের একটি চক্র আরব জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ঠিক আগে রোমকরা ছিল উন্নত। তার আগে ভারত, চিন ও গ্রিকরা। তারও আগে মিশর। তারও আগে মেসোপোটেমিয়া। এটা জেনে রাখবেন জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় তার অবস্থানের জন্যেই মধ্যপ্রাচ্য কখনই ব্রাত্য থাকেনি। কখনও নেতৃত্ব দিয়েছে কখনও অন্যদের চর্চার সুফল ভোগ করেছে।

যাদের আপনি ধর্মান্ধ বলছেন তাদের নব্যউত্থানের বিষয়টি আপনার চোখে না পড়লেও বহু মানুষের চোখে পড়েছে। তার কয়েকটা উদাহরণ দিই, সমস্ত আরব দেশে মহিলারা পুরুষদের তুলনায় লেখা-পড়ায় এগিয়ে। তারা নিজেদের অধিকার বিষযে সচেতন। পশ্চিমবঙ্গের ২০১৬-র মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ২৫ শতাংশ সংখ্যালঘু সুযোগ পেয়েছে, প.বঙ্গের অডিট-অ্যাকাউন্টস পরীক্ষার মোট ৫৮ জনে ১০ জন সুযোগ পেয়েছে (১৭%) যার মধ্যে দ্বিতীয় হয়েছে কাজি জহিরুল হাসান। মুসলিমদের এই ধরনের সাফল্যর পিছনে আল আমিন মিশন, আল মামুন মিশন, জি়ডি পরিচালিত মিশনগুলির অবদান নিশ্চয় আপনার জানা আছে। আপনি হাওড়ার মানুষ খলতপুরের আল আমিন আন্দোলন একটি মাদ্রাসা থেকেই শুরু হয়েছে এটাও নিশ্চয় জানা। আপনার বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার তাদের অধিকাংশই আল আমিন বা ওইধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষিত। তারা শিখে গেছে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানি হওয়া যায় আবার ধর্মকে স্বস্থানে রাখা যায়। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বহু বেশি সচেতন।
মাদ্রাসা প্রসঙ্গে বলি আপনি সংবিধানের ৩০ ধারায় সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান স্থাপন, পরিচালন ইত্যাদি বিষয়ে সংবিধান প্রদত্ত অধিকারে হস্তক্ষেপ বিষয়ে একটা আন্দেলন খাড়া করুন তবে বলব আপনি সঙ্ঘপরিবারকে তোষণ করছেন না। আসামে মাদ্রাসাগুলিতে শুক্রুবার ছুটি হটিয়ে রবিবার করা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডকে তুলে দিযে স্কুল শিক্ষা বোর্ডের আওতায় আনা পুরোপুরি সংবিধানবিরোধী। তালাক ছেড়ে দিয়ে এ বিষয়ে মনোযোগ দিন। কারণ তালাক দশমিকেরও নিচে। কিন্তু সংখ্যালঘু অধিকারে হস্তক্ষেপ, আইন ও প্রশাসনকে হাস্যকর পর্যায়ে নিযে যাওয়া বিশ্বের দরবারে ভারতের মাথা হেঁট করছে। বরকতির বক্তব্য বা আই এস-এর সন্ত্রাস বিষয়ে মুসলিমরাই খড়্গহস্ত। কারণ একটা বিষযে সবাই জানে এই ধরনের বক্তব্য ও সন্ত্রাস মুসলিমদরেই বেশি ক্ষতি করছে।

-লেখা‌টি পা‌ঠি‌য়ে‌ছেন চৌধু‌রী আতিকুর রহমা‌ন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *